উপন্যাসের কথক খোকা, ছয় ভাইবোনের একজন। তার বড় বোন রাবেয়া, যার বাবা এবং খোকার বাবা দুই ভিন্ন ব্যক্তি। রাবেয়ার মা একসময় এক ধনী ব্যক্তির ঘরে বউ হয়ে গিয়েছিলেন, সেখানেই জন্ম রাবেয়ার। কিন্তু সেই সম্পর্ক টিকেনি; বিচ্ছেদের পর তিনি ফিরে আসেন তার অভিজাত পিতৃগৃহে।
রাবেয়ার মা ছিলেন অপূর্ব রূপসী, সুমধুর কণ্ঠের অধিকারী। তার বাবার বাড়ি ছিল বিলাসবহুল, আভিজাত্যে পূর্ণ। সেই বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিল এক গরীব ছাত্র, নাম তার আজহার হোসেন। একদিন রাবেয়ার মায়ের কণ্ঠে গান শুনে আজহার মুগ্ধ হয়ে পড়েন, হৃদয়ে জেগে ওঠে প্রেম। কিছুদিন পরেই তাদের বিয়ে হয়। রাবেয়ার মা তার বাবার বাড়ির সমস্ত আভিজাত্য, আরাম-আয়েশ ছেড়ে আজহার সাহেবের সাদামাটা সংসারে পা রাখেন।
দীর্ঘ তেইশ বছরের দাম্পত্যজীবনে একে একে জন্ম নেয় খোকা ও তার আরও চার ভাইবোন। তাদের সংসার ছিল সাদামাটা, অভাব-অনটন লেগেই থাকত। তবুও সে সংসারে ছিল মায়ার বন্ধন। কিন্তু খোকার মা আর কখনো আগের মতো হাসিখুশি হয়ে ওঠেননি। তার অন্তরে যেন লুকানো ছিল গভীর এক বিষাদ।
খোকার মা জন্মগতভাবেই ছিলেন অভিজাত, আর খোকার বাবা ছিলেন একেবারেই সাদামাটা, দরিদ্র পরিবারের সন্তান। এই পার্থক্যের কারণে তাদের মাঝে কখনো হৃদয়ের গভীরতা তৈরি হয়নি। খোকার বাবা যদিও তাকে ভালোবাসতেন এবং সম্মান করতেন, তবু তার স্ত্রী থাকতেন চুপচাপ, গম্ভীর। রাবেয়া ছাড়া আর কোনো সন্তান তার স্নেহের পরশ তেমনভাবে পায়নি। বড়লোকি জীবন ছেড়ে আসার কষ্ট তাকে নিঃশেষ করে দিয়েছিল। সেই কষ্ট বুকে চেপে তিনি গানপাগলী হয়েও আর কখনো গান গাইতে পারেননি।
খোকা মনের গোপন কোণে ভালোবাসত তার ছোটখালার মেয়ে কিটকিকে। কিটকিও তাকে ভালোবাসত। কিন্তু কিটকির পরিবার হঠাৎ করেই পাঁচ বছরের জন্য ম্যানিলায় চলে গেলে তাদের দূরত্ব তৈরি হয়। কিটকি ফিরে এলেও ভাগ্য তাদের মিলন ঘটায়নি। খোকার জীবনের এই অধ্যায় অসম্পূর্ণই থেকে যায়।
ছোটবোন রুনু বিয়ের আসরে বসেছিল, কিন্তু তার মনের মানুষের সাথে বিয়ে হয়নি। সে আঘাত সহ্য করতে পারেনি, দুঃখে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে এবং শেষমেষ তার করুণ মৃত্যু ঘটে। রাবেয়ারও বিয়ে হয়নি, কারণ তার গায়ের রং ছিল কালো। সমাজের প্রচলিত রূপের সংজ্ঞা তার জন্য সুখের দুয়ার বন্ধ করে দিয়েছিল।
খোকার ছোট ভাই মন্টু ছিল অমনোযোগী ছাত্র, কিন্তু তার কবিতা ছিল মুগ্ধকর। পত্রিকায় তার লেখা প্রকাশিত হলে সবাই তার প্রতিভার প্রশংসা করত। তবুও তার ভবিষ্যৎ ছিল অনিশ্চিত, দিকহীন।
সময়ের স্রোতে কাছের মানুষগুলো একে একে দূরে সরে যেতে থাকে। রাবেয়া শহরের এক মহিলা হোস্টেলের সুপারিন্টেনডেন্ট হয়ে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। মন্টুও তার তারুণ্যের ব্যস্ততায় মেতে ওঠে। আর খোকা? সে পুরোনো দিনের স্মৃতিগুলোকে হৃদয়ে আঁকড়ে ধরে, এক বুক নিঃসঙ্গতা নিয়ে ডুবে যেতে থাকে অতীতের প্রাচুর্য ও হারানোর বেদনায়।
এভাবে সময় বয়ে চলে, আর খোকার জীবনের গল্প রয়ে যায় অতৃপ্ত, অসম্পূর্ণ…
Reviews
Clear filtersThere are no reviews yet.